৮০ বছরেও জোটেনি বয়স্কভাতা, ভিক্ষা করেই জীবন চলে আইজন বেওয়ার

এস.আর শরিফুল ইসলাম রতনঃ নাম আইজন বেওয়া। বয়স প্রায় ৮০ বছর। স্বামী মারা গেছেন অনেক আগে। নেই কোনো সন্তান, বাড়ি বা জমি। এক মুঠো ভাতের আশায় তাই ভিক্ষা করেই বছরের পর বছর কেটে যাচ্ছে তার জীবন।
লালমনিরহাট জেলা শহরের ব্যস্ততম এলাকা মিশনমোড়ের একটি হোটেলের সামনে দৈনিক সংবাদ দিগন্ত প্রতিনিধি যেতেই হাত পেতে আইজন বেওয়া বলে বাবা মোক (আমাকে) দুইটা টাকা দিমেন. আইজ (আজ) সকাল থাকি (থেকে) মুই (আমি) কিছুই খাং (খাই) নাই।
পকেট থেকে একটি দশ টাকার নোট বের করে দিয়ে বললেন সরকার থেকে আপনাকে কিছু দেওয়া হয় নাই বা আপনি সরকার থেকে কিছু পাননি. এ কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে সে বলে উঠলো বাবা মিথ্যা কথা কবাং নং (বলবো না) একবার খালি মেলেটারী (আর্মি) আসি (এসে) একনা (একটু) চাইল, ডাইল দিয়া গেছলো, ওইটাই শ্যাষ (ওটাই শেষ)। এভাবেই কান্না জড়িত কন্ঠে কথা গুলো বলছিলেন আইজন বেওয়া।
প্রতিদিন সকাল হলেই দরজার কড়া নেরে ভিক্ষুকরা বলে বাবা/মা ভিক্ষা দেবেন.? অথচ লালমনিরহাট জেলা প্রশাসন জেলাকে ভিক্ষুক মুক্ত করার লক্ষ্যে ভিক্ষুকদের নামের তালিকা তৈরী করে তাদের জিবিকা নির্বাহের জন্য সরকারী ভাবে বন্দোবস্ত করা হলেও আইজন বেওয়ার মতো শত শত ভিক্ষুককে জেলার বিভিন্ন স্থানে ভিক্ষা করতে দেখা যায়। যদিও লালমনিরহাট জেলার মাত্র কয়েকটি ইউনিয়নকে ভিক্ষুক মুক্ত ঘোষনা করা হয়েছে।
জানা গেছে, লালমনিরহাট জেলা শহরের বালাটারী (বিএনপি কলোনী) রেলওয়ের একটি পরিত্যাক্ত কোয়াটারে তার বসবাস। শরীরে যখন শক্তি ছিল তখন আইজন বেওয়া জেলা শহরের বিভিন্ন বাসা বাড়িতে কাজ করে অতিকষ্টে জীবন-যাপন করছেন। বর্তমানে তিনি লালমনিরহাট পৌরসভার ১নং ওয়ার্ডের জেলা শহরের বালাটারী (বিএনপি কলোনী) রেলওয়ের একটি পরিত্যাক্ত কোয়াটারে অতিকষ্টে বসবাস করছেন।
ফজরের আজান হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বের হয়ে পড়েন আইজন বেওয়া। দিনভর শহরের বিভিন্ন স্থানে ভিক্ষা করে চলে তার জীবন। লাঠি ভর করে চলা এই মানুষটি ঠিক মতো দেখেন না চোখেও। তাই ভিক্ষা করতে গিয়ে অনেকবার ঘটেছে দূর্ঘটনা। প্রায় প্রতিদিন তাকে লালমনিরহাট জেলা শহরের প্রান কেন্দ্র মিশনমোড়ের চমক হোটেলের সামনে রাস্তার পাশে ভিক্ষা করতে দেখা যায়।
বয়সের ভারে ঠিকভাবে কথা বলতে না পারা আইজন বেওয়া জানান, তার স্বামী, সন্তান, বাড়িঘর কিছু নাই। তার বাবার বাড়ি সদর উপজেলার খুনিয়াগাছ ইউনিয়নে।  টাকা-পয়সার অভাবে খেতে পরতে পারি না। অসুখে ওষধ কিনে খেতে পারি না, প্রায় দিন তাকে উপোষ থাকতে হয়।
তিনি বলেন, অসুস্থ শরীর নিয়েও রাস্তায় নামতে হয় ভিক্ষার আশায়। দিন শুরু হলেই ওইদিনের খাবারের কথা চিন্তা করতে হয় তাকে। থাকার জন্য রেলওয়ের জ্বরাজির্ন পরিত্যাক্ত এই কোয়াটারটা না পেলে হয়তো গাছ তলাতেই থাকতে হতো তাকে। তাই সারাদিন ভিক্ষা করে ক্লান্ত শরীরে ওই পরিত্যাক্ত বাসায় ফিরে একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন আর আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করেন তিনি অন্তত তার থাকার জন্য একটু ব্যবস্থা করেছেন।
এ ব্যাপারে লালমনিরহাট সুশিল সমাজের ব্যক্তিরা বলেন, ভিক্ষকদের পুনর্বাসনের জন্য ভিক্ষুক মুক্ত বাংলাদেশ গড়া একটি যুগোপযোগি কর্মসুচি। যদিও এই কর্মসুচি বা উদ্যোগ বাস্তবায়ন কঠিন ব্যাপার। তারপরেও এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই আমরা। যার অংশ হিসেবে লালমনিরহাটে ভিক্ষুকদের নামের তালিকা তৈরী কার্যক্রম শুরু হয়েও  করোনা ভাইরাসের কারনে সে উদ্যোগে ভাটা পড়ে।
ইতিমধ্যে হাতীবান্ধা উপজেলার সিন্দুর্না, কালীগঞ্জ উপজেলার তুষভান্ডার ও সদর উপজেলার মোগালহাট ইউনিয়নকে ভিক্ষুক মুক্ত ঘোষনা করা হয়। পুনর্বাসনের জন্য প্রতিটি ভিক্ষুককে হাঁস, মুরগী, ছাগল, গরু ও টাকা দিয়ে স্বাবলম্বি হওয়ার জন্য কার্যক্রম শুরু করা হলেও মরনঘাতি করোনা ভাইরাসের কারনে কাজ কর্ম না থাকায় সেই সব ভিক্ষুকদের আবারও ভিক্ষা করতে বিভিন্ন স্থানে দেখা যায়। যে কারনে সরকারের এই মহৎ উদ্যোগ ভেস্তে যেতে বসেছে।
লালমনিরহাট জেলা শহরের এক মুদি দোকানদার বলেন, আপনি কোথায় শুনেছেন লালমনিরহাটে ভিক্ষুক নেই, ভিক্ষুক মুক্ত করা হয়েছে.? যে ইউনিয়ন গুলোর কথা আপনারা বলছেন সেই সব ইউনিয়নের ভিক্ষুকদেরকেই আমাদের বেশি চোখে পড়ে। সারাদিন ভিক্ষা দিতেই একজন দোকানদারকে এক থেকে দেড়শ টাকা লাগে। আর আপনারা বলছেন জেলায় ভিক্ষুক নেই।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইউনিয়ন পরিষদের এক সচিব দৈনিক সংবাদ দিগন্ত কে বলেন, একজন ভিক্ষুক সারাদিন ভিক্ষা করে যে টাকা-পয়সা পান তা দিয়ে পেটে ভাতই হয় না অনেক সময়। ওষুধ, কাপড়-চোপড় কেনা তো দুরের, বেঁচে থাকাই তার জন্য খুবই কষ্টের।
তিনি আরও বলেন, আমার জানা মতে বয়স্ক ভাতাসহ সরকারি কোন সুযোগ সুবিধাই পাননি ওই আইজন বেওয়া। যদি কোন দানশীল বা দয়াবান ব্যাক্তি তার জন্য এগিয়ে আসতো তাহলে তার জীবনটা কিছুটা হলেও সহজ  হতো।
লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো. আবু জাফর দৈনিক সংবাদ দিগন্ত কে বলেন, জেলায় খুব জোড়ালো ভাবে ভিক্ষুক মুক্ত কার্যক্রমটি শুরু করা হলেও করোনা ভাইরাসের কারনে কার্যক্রমটি সাময়িক বন্ধ আছে। তবে দেশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে কার্যক্রম পুনরায় শুরু করা হবে বলেও জানান তিনি।