শাহীন চৌধুরী ডলির প্রবন্ধ “স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু”

শাহীন চৌধুরী ডলিঃ  ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ বর্গীরা ভারতবর্ষ থেকে বাধ্য হয়ে ক্ষমতা তুলে নিয়ে গেলেও মূলত তারা তাদের হাতে তৈরি দেশীয় একটি বিশেষ শ্রেণির হাতেই ক্ষমতা তুলে দিয়ে গিয়েছিল। দেশভাগে ভারতবর্ষ ভেঙ্গে দুটি দেশ গঠিত হলেও দুটি দেশ অন্তর্গত চরিত্রে আগে যেমন ছিল তেমনই আমলাতান্ত্রিক ও শোষণমূলক রয়ে গেল। অল্পকিছু বিশেষ শ্রেণির মানুষের সুযোগ বৃদ্ধি পেলেও বাদবাকিরা ব্রিটিশ আমলের মতই শোষিত হতে থাকলো। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর থেকে ২৩ বছরের পাকিস্তানি শাসন ও একাওরে গণহত্যার ভেতর দিয়ে বাংলাদেশকে যেতে হয়েছে। ভারতবর্ষের দুইপ্রান্তে দুটি এলাকা নিয়ে পাকিস্তানের সৃষ্টিতে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের অধিবাসীদের ভেতর ধর্ম ছাড়া কোন বিষয়ে সাদশ্যৃ ছিলো না। ধর্মের ক্ষেত্রেও আচরণগত অভিন্নতা ছিলো না।

 

দেশভাগে লক্ষ লক্ষ মানুষ উদ্বাস্তু হয়েছে, হাজার হাজার মানুষ দাঙ্গায় প্রাণ দিয়েছে, শত শত নারীর সম্ভ্রমহানি ঘটেছে। আসলে স্বাধীনতার নামে কেবল ক্ষমতার হস্তান্তরই ঘটেছিলো। পূর্ব পাকিস্তানের সম্পদ বিভিন্ন যুগে দেশের ভূ-সীমার বাইরে চলে গেছে। মোগলরা দিল্লিতে পাঠিয়েছে , ইংরেজরা ইংল্যান্ডে পাঠিয়েছে, পাকিস্তানি শাসকরা রাওয়ালপিন্ডিতে পাঠানো শুরু করেছিল। পাকিস্তানিদের কর্তৃত্ব্বপরায়ণতা, শাসন, শোষণ, চাকরিসহ সর্বক্ষেত্রে বৈষম্য পূর্ব পাকিস্তানিদের মনে রোষের জন্ম দেয়। পাকিস্তানের জন্মলগ্ন থেকে এর পূর্ব  অংশ পশ্চিম অংশের তুলনায় নানাভাবে বঞ্চিত হতে থাকে এবং স্বাধীন বাংলাদেশের জন্মের আগ পর্যন্ত দীর্ঘ ২৩ বছর ছিল পশ্চিম পাকিস্তান কর্তৃক পূর্ব পাকিস্তানকে শোষণ-বঞ্চনার ইতিহাস।

 

১৯৭১ সালে আমরা দ্বিতীয়বারের মতন স্বাধীন হলাম। ভোটের জোরে একাওরের স্বাধীনতা আসেনি, ত্রিশ লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে, রক্তের বিনিময়ে, মা- বোনের সম্ভ্রম হারানোর বিনিময়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা এসেছে। ১৯৪৭ সালের ২৩ বছর পর ১৯৭১ সালে আবারও মানুষ যুদ্ধ করেছে। রাষ্ট্র ভেঙ্গে নতুন রাষ্ট্র বাংলাদেশের জন্ম হয়েছে। তবে ব্যাপারটা এত সহজ ছিল না। বাংলাদেশের স্বাধীনতার রূপকার এবং স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে দেশের স্বাধীনতার জন্য বার বার কারাবরণ করতে হয়েছে।

 

১৯৬৬ সালে আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমানের ছয়দফা কর্মসূচির মাধ্যমে স্বায়ত্তশাসনের দাবি পূর্ব পাকিস্তানে ব্যাপক গণসমর্থন লাভ করে।এতে স্বাধিকার আন্দোলনের গতি তীব্র হয়। নিরাপত্তা আইনে ১৯৬৬ সালের ৯মে জেলে আটককৃত শেখ মুজিবুর রহমান ও অন্যান্যদের জেল থেকে মুক্তি দিয়ে সামরিক আইনে পুনরায় গ্রেফতার করে  ঢাকা সেনানিবাসে সামরিক হেফাজতে নিয়ে যাওয়া হয়।গ্রেফতারকৃতদের বিরুদ্ধে প্রথমে কোর্ট মার্শাল করার সিদ্ধান্ত নিলেও সরকার সত্তর সালের সাধারণ নির্বাচনের কথা মনে রেখে পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব উচ্চপদস্থ বাঙালি অফিসারদের বেসামরিক  আইনে অভিযুক্ত করে।

 

আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় প্রধান আসামী করা হয় শেখ মুজিবুর রহমানকে। শেখ মুজিবসহ  ৩৫ জনকে আসামী করে তাদের বিরুদ্ধে চার্জশীট দাখিল করা হয়।

এ মামলায় অভিযুক্ত যে ৩৫ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করা হয় তারা হচ্ছেন –

১) শেখ মুজিবুর রহমান

২) লে, কমান্ডার মোয়াজ্জেম হোসেন

৩) প্রাক্তন এল এস সুলতান উদ্দিন আহমেদ

৪) স্টুয়ার্ড মুজিবুর রহমান

৫) এল সি ডি নূর মোহাম্মদ

৬) আহমেদ ফজলুর রহমান সিএসপি

৭) ফ্লাইট সার্জেন্ট মাহফিজ উল্লাহ

৮) কর্পোরাল মোহাম্মদ আবদুস সালাম

৯) প্রাক্তন হাবিলদার দলিল উদ্দিন

১০) রুহুল কুদ্দুস সিএসপি

১১) ফ্লাইট সার্জেন্ট মোহাম্মদ ফজলুল হক

১২) ভূপতিভূষণ চৌধুরী ওরফে মানিক চৌধুরী

১৩) বিধানকৃষ্ণ সেন

১৪) সুবেদার আবদুর রাজ্জাক

১৫) ফ্লাইট সার্জেন্ট মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাক

১৬) প্রাক্তন হাবিলদার ক্লার্ক মুজিবুর রহমান

১৭) সার্জেন্ট জহুরুল হক

১৮) খান এম শামসুর রহমান সি এস পি

১৯) লে, এ জি মোহাম্মদ খুরশিদ সারের কটেজ

২০) রিসালদার এ কে এম শামসুল হক

২১) হাবিলদার আজিজুল হক

২২) এসসি মাহফুজুল বারী

২৩) সার্জেন্ট শামসুল হক

২৪) মেজর শামসুল আলম

২৫) ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ আবদুল মোতালেব

২৬) ক্যাপ্টেন এম শওকত আলী মিয়া

২৭) ক্যাপ্টেন খন্দকার নাজমুল হুদা এএমসি

২৮) ক্যাপ্টেন এ.এন.এম নুরুজ্জামান

২৯) সার্জেন্ট আবদুল জলিল

৩০) মোহাম্মদ মাহবুব উদ্দিন চৌধুরী

৩১) ফাস্ট লে,এম এস এস রহমান

৩২) সুবেদার এ কে এম তাজুল ইসলাম

৩৩) মোহাম্মদ আলী রেজা

৩৪) ক্যাপ্টেন খুরশিদ উদ্দিন আহমেদ

৩৫) ফাস্ট লে, আবদুর রউফ

 

আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার ভিত্তি ছিল দুটি দলিল –

১) লে কমান্ডার মোয়াজ্জেম হোসেন ডায়েরি

২) শামসুর রহমান কর্তৃক ফরিদপুরের ডি সি কে লেখা চিঠি।

উক্ত দলিলগুলো কিভাবে সেনা গোয়েন্দা বিভাগের হাতে গেল সেটা জানা যায় নি।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘটনার সাথে জড়িত না থাকা সত্বেও তাকে  ঐ মামলায় জড়ানোর কারণ ছিলো

শেখ মুজিবের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অবসান ঘটানো। পাকিস্তানের শাসকচক্র ভেবেছিলেন, জনগণ যখন জানতে পারবে শেখ মুজিব ভারতের দালাল হয়ে পাকিস্তানের অখণ্ডতার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত তখন তার বিরুদ্ধে বিক্ষোভে ফেটে পড়বে। কিন্তু পরিণতি হয়েছিল সম্পূর্ণ উল্টো। এতে শেখ মুজিব আওয়ামী লীগের দলীয় নেতা থেকে পরিণত হয়েছিলেন বাঙালির স্বাধীকার আন্দোলনের অবিসংবাদিত  নেতা হিসেবে এবং তিনি বঙ্গবন্ধু উপাধি লাভ করেছিলেন।

 

আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার বিচারের জন্য ফৌজদারি দন্ডবিধি সংশোধন করে বিশেষ ট্রাইবুনাল গঠন করা হয়।মামলায় শেখ মুজিবুর রহমানকে ১ নম্বর আসামি করে ‘ রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিবুর রহমান গং ‘ নামে মামলাটি পরিচালিত হয়। ঢাকার কুর্মিটোলা সেনানিবাসে একটি সুরক্ষিত কক্ষে ট্রাইবুনালের বিচার কার্যক্রম শুরু হয়। সরকার পক্ষে মামলায় ১১ জন রাজসাক্ষীসহ মোট ২২৭ জন সাক্ষীর তালিকা আদালতে পেশ করা হয়। এরমধ্যে ৪ জন রাজসাক্ষীকে সরকার পক্ষ থেকে শত্রু বলে ঘোষণা করা হয়। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকে পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি জনগণ বিভিন্নভাবে উপেক্ষিত, বঞ্চিত, অবহেলিত হতে হতে পূর্ব পাকিস্তানের সামরিক ব্যক্তিসহ বিভিন্ন শ্রেণির জনগণের মধ্যে পাকিস্তানি শাসকদের বিরুদ্ধে অসন্তোষ ও ক্ষোভ ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছিল।

 

সামরিক বাহিনীতে বিদ্যমান বৈষম্যের কারণে সশস্ত্রবাহিনীর কিছু সংখ্যক বাঙালি অফিসার ও সিপাহি অতি গোপনে সংগঠিত হতে থাকেন এবং পূর্ব পাকিস্তানকে স্বাধীন করার প্রত্যাশায় গোপনে কাজ করে যেতে থাকেন। কিন্তু পাকিস্তান সরকারের সুচতুর গোয়েন্দা সংস্থার তৎপরতার কারণে এ ষড়যন্ত্র প্রকাশ পেয়ে গেলে পাকিস্তানি সরকার গ্রেফতারি তৎপরতা চালিয়ে প্রায় দেড় হাজার বাঙালিকে গ্রেফতার করে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র দপ্তর  ১৯৬৮ সালের ৬ জানুয়ারি এক প্রেসনোটে ঘোষণা করে যে, সরকার ১৯৬৭ সালের ডিসেম্বর মাসে পাকিস্তানের জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী এক চক্রান্ত উদঘাটন করেছে। এতে অভিযোগ করে বলা হয় গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিরা ভারত সরকারের সহায়তায় এক সশস্ত্র অভ্যুত্থানের মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানকে কেন্দ্র হতে বিচ্ছিন্ন করার প্র‍য়াসে লিপ্ত ছিলেন। ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলা শহরে ভারতীয় পক্ষ ও আসামী পক্ষের মধ্যে এ ষড়যন্ত্র পরিকল্পনা করা হয়েছিল বলে মামলায় উল্লেখ থাকায় একে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা  নামে আখ্যায়িত করা হয়েছিল।

 

স্বরাষ্ট্র দপ্তর ১৯৬৮ সালের ১৮ জানুয়ারি অপর এক ঘোষণায় শেখ মুজিবুর রহমানকে এ ষড়যন্ত্রে অভিযুক্ত করে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা এবং এর প্রতিক্রিয়া বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। পাকিস্তান সরকার ১৯৬৮ সালের জানুয়ারি মাসে আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রধান আসামি করে সেনাবাহিনীর কয়েকজন কর্মরত ও প্রাক্তন সদস্য এবং ঊর্ধ্বতন সরকারি অফিসারদের বিরুদ্ধে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করে।  তাদের নামে অভিযোগ ছিল তারা ভারত সরকারের অর্থ ও অস্ত্রের সহায়তায় সশস্ত্র অভ্যুত্থানের মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানকে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়ে রাষ্ট্রদ্রোহী অপরাধ করেছে। পাকিস্তান সরকার মনে করেছিলেন, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা করে শেখ মুজিবুর রহমানকে দেশের মানুষের কাছে ভারতীয় চর ও বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসেবে চিহ্নিত করতে পারলে জনগণের সমর্থন সরকারের পক্ষে যাবে এবং শেখ মুজিবকে কঠোর সাজা প্রদান করা যাবে। কিন্তু সরকারি সাক্ষীরা  কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে সরকারের বিরুদ্ধে বিষোদগার করতে থাকলে সরকার বিপাকে পড়ে। এতে দেশবাসীর কাছে সরকারের চক্রান্ত সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে।

 

সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ও মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী সরকারি এ চক্রান্তের বিরুদ্ধে এবং মামলা প্রত্যাহার ও শেখ মুজিবসহ সকল বন্দির মুক্তির দাবিতে গণ আন্দোলন গড়ে তোলেন। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার বিরুদ্ধে সাধারণ জনতা প্রতিবাদমুখর হয়ে উঠলে প্রবল গণআন্দোলন তথা উত্তাল ঊনসত্তরের

গণ-অভ্যুত্থানের মুখে শেষ পর্যন্ত আইয়ুব সরকার ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করে নিতে বাধ্য হয়। ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুথানের মাধ্যমে দেশের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনের কারণে সরকার প্রধান হিসেবে আইয়ুব খান সমগ্র পাকিস্তানের রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়ে গোলটেবিল বৈঠক আয়োজন করতে বাধ্য হয়েছিলেন। ‘ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান’ নামক এই গণ-আন্দোলনের মুখে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করে নেয় এবং শেখ মুজিবুর রহমানসহ সকল বন্দিকে নিঃশর্ত মুক্তি দেয়া হয়।

 

১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে এক বিশাল জনসভায় শেখ মুজিবুর রহমানসহ মামলায় অভিযুক্তদের এক গণসম্বর্ধনা দেয়া হয় এবং শেখ মুজিবুর রহমানকে সেদিনের সেই জনসভায় ‘ বঙ্গবন্ধু ‘ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান নামক এই জনআন্দোলনের মুখে ১৯৬৯ সালে পাকিস্তানের শাসক জেনারেল আইয়ুব খানের পতন ঘটে। তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন আর প্রেসিডেন্ট হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন না।ঐতিহাসিকগণ এই মামলা এবং মামলা থেকে সৃষ্ট গণআন্দোলনকে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের পেছনে প্রেরণাদানকারী অন্যতম প্রধান ঘটনা বলে গণ্য করে থাকেন। নতুন বাংলাদেশ রাষ্ট্র গঠনে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা এবং এ থেকে শুরু হওয়া আন্দোলন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে অন্যতম প্রেরণাদানকারী হিসেবে কাজ করেছে।

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলা থেকেই ১৯৬৯ -এর ২৩ ফেব্রুয়ারি থেকে সেই ঐতিহাসিক অগ্নিঝরা দিনগুলোর যাত্রা শুরু হয়েছিল। রেসকোর্স ময়দানে সেদিন শেখ মুজিব জানান, তিনি পাকিস্তান সরকারের কাছে এগারো দফা দাবি তুলে ধরবেন। বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা চেয়েছিলেন, তিনি যদি ছয় দফা না দিতেন আগরতলা মামলা হতো না। এই মামলা না দিলে গণঅভ্যুত্থান হতো না। এই গণঅভ্যুত্থান না হলে তাকে কারাগার থেকে মুক্ত করা যেতো না। আর তিনি মুক্তি না পেলে সত্তরের নির্বাচনে জয়ী হওয়া সম্ভব হতো না। বঙ্গবন্ধু যদি সত্তরের নির্বাচনে বিজয়ী না হতেন তাহলে আমরা একাওরে মুক্তিযুদ্ধ করে স্বাধীনতা লাভ করতে পারতাম না। এই গণআন্দোলন কেবল ছাত্র বা রাজনৈতিক কর্মীদের মধ্যে নয়, বরং কৃষকের মধ্যে, শ্রমিকের মধ্যে, সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছিল – ফলে তা গণঅভ্যুত্থান হয়ে উঠেছিল। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ত্রিপুরার ভূমিকা প্রশ্নাতীত, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের এই গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোর সঙ্গে একটাই নাম জড়িয়ে আছে – তা হলো ত্রিপুরা, বা আরো সুনির্দিষ্টভাবে বললে আগরতলা।

 

বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পেছনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভূমিকা অনস্বীকার্য। শুরুতে আমরা ছিলাম ভারতীয়। বাংলাদেশ জন্মের আগে ছিলাম পাকিস্তানি।

১৯৬০ এর দশকে চারটি লক্ষ্য দ্বারা বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংগ্রাম পরিচালিত হয়। এগুলো হলো-

১) গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, যাতে পূর্ব বাংলার জনসংখ্যার ভিত্তিতে ও নির্বাচনের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় সরকারে বাঙালিরা প্রতিনিধিত্ব করতে পারে।

২) স্বায়ত্তশাসনের দাবি মানতে বাধ্য করা ও তার মাধ্যমে স্বশাসন নিশ্চিত করা।

৩) কেন্দ্রীয় সরকার যে সম্পদ নিজের ভোগে লাগাচ্ছে, তা বাংলাদেশের উন্নয়নে সরবরাহ করা।

৪) বাংলা ভাষা বাংলাদেশের সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। বাংলাকে পূর্ব পাকিস্তানের জাতীয় ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করা।

১৯৫২ সাল থেকে শুরু করে ১৯৬০ এর দশক পর্যন্ত যত রাজনৈতিক সংগ্রাম হয়েছে তার মূলে উক্ত চারটি উদ্দেশ্য কাজ করেছে। বাংলাদেশের মানুষের রাজনৈতিক সংগ্রামে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক ও মাওলানা ভাসানীর মতো কয়েকজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন অগ্রদূত। কিন্তু বাঙালি জাতীয়তাবোধকে একটা দৃঢ় ভিত্তির উপর দাঁড় করাতে রাজনৈতিক উদ্যোগ প্রয়োজন ছিল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন সে উদ্যোগের প্রবক্তা, তিনিই ছিলেন রাজনৈতিক উদ্যোগের অনুঘটক।

 

১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি লাহোরে বিরোধী দলসমূহের জাতীয় সম্মেলনের বিষয় নির্বাচনী কমিটিতে বঙ্গবন্ধু ঐতিহাসিক ৬ দফা দাবি পেশ করেন। প্রস্তাবিত ৬ দফা ছিল বাঙালির জাতির মুক্তির সনদ। এই দাবিই ১৯৬৯ সালের মার্চের ঐতিহাসিক নির্বাচনী প্রচার থেকে শুরু করে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত ঘটনাপ্রবাহকে নিয়ন্ত্রণ করেছে। এভাবে বঙ্গবন্ধুর যে স্বাধিকার সংগ্রাম, তাতে প্রভাবশালী ভূমিকা রেখেছে।বঙ্গবন্ধুকে এই কাজে তার জ্যেষ্ঠ ও কনিষ্ঠ সহকর্মীদের আত্মত্যাগ উদ্বুদ্ধ করেছিল। রাজনীতির ভেতরের ও বাইরের সকল উদ্যোগকে এক সুতোয় গাঁথার কাজটি বঙ্গবন্ধু করেছিলেন। ১৯৬৯ থেকে ১৯৭১ সাল -এ দুই বছর বাঙালিদের মধ্যে যেন কোন বিভক্তি না ঘটে তা বঙ্গবন্ধু নিশ্চিত করেছিলেন।

 

১৯৬৯ থেকে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক বার্তার মূল বার্তা ছিল- বাঙালিরা শুধু সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক দিক থেকেই পাকিস্তানিদের চেয়ে আলাদা নয়, বরং বাঙালি একটি জাতি। বঙ্গবন্ধুর বাণী শহর,  গ্রাম, গঞ্জে পৌঁছে দিতে সক্রিয় ছিলেন বঙ্গবন্ধুর প্রধান সহযোগী তাজউদ্দীন আহমদ এবং অন্য গুরুত্বপূর্ণ নেতারা। এই দুই বছর সময়ে বঙ্গবন্ধু অপ্রতিদ্বন্দ্বী নেতায় পরিণত হয়েছিলেন। তিনিই তখন বাঙালির আশা আকাঙখার মূর্ত প্রতীক। এ সময়ে বঙ্গবন্ধুর একটি রাজনৈতিক দলের প্রধান থেকে বাংলাদেশের বাঙালিদের জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হিসেবে উত্তরণ ঘটলো। বঙ্গবন্ধুর প্রতি বাঙালিরা তাদের সমর্থনের বহিঃপ্রকাশ ঘটালেন ১৯৭০ সালের নির্বাচনে। ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭টি আসনেই আওয়ামী লীগ জয়লাভ করলো। মোট ভোটের ৭৫ শতাংশই পেলো বঙ্গবন্ধুর দলটি। ১৯৭০ এর নির্বাচনের রাজনৈতিক ফলাফল জাতীয় পরিষদে আওয়ামী লীগের নিরংকুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা ও প্রাদেশিক পরিষদেও তার সর্বময় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। এর মাধ্যমে বাঙালিরা পুরো বিশ্বকে জানিয়ে দিতে সমর্থ হলো যে তারা একটি স্বতন্ত্র জাতি এবং তারা বঙ্গবন্ধুর উপর স্বশাসনের দাবি আদায়ের দায়িত্ব দিয়েছে।

 

ভুট্টো কিংবা ইয়াহিয়া কেউই আগে থেকে আওয়ামী লীগের ভূমিধ্বস জয় সম্পর্কে আঁচ করতে পারেনি। এমনকি তাদের গোয়েন্দা বাহিনীও নির্বাচনের সম্ভাব্য ফলাফল নিয়ে ভুল তথ্য দিয়েছিল। ১৯৪৭ সাল থেকে পাকিস্তানিরা যে ক্ষমতার দুর্গ গড়ে তুলেছিল, সেটি যে হুমকির মুখে পড়েছে নির্বাচনের পর পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী সেটা টের পেল। ১৯৭০ এর নির্বাচনি ফলাফলের মধ্য দিয়ে ৬ দফা পাকিস্তানের ক্রমপ্রকাশমান রাজনৈতিক সংকট সমাধানের ন্যুনতম দাবি হয়ে উঠেছিল। পরে তা নতুন মাত্রা পেল। ১৯৭১ সালের মার্চ নাগাদ বঙ্গবন্ধু অপ্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রনায়কে পরিণত হলেন। তাঁর পেছনে তখন বাংলাদেশের গোটা প্রশাসন। পৃথিবীর কোন স্বাধীনতাযুদ্ধে, স্বাধীনতার স্বীকৃতি পাওয়ার আগে এমন আনুগত্যের ঘটনা আর দেখা যায় নি। আসলে বাংলাদেশ একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে স্বাধীনতা লাভ করেছে। ১৯৭১ সালের মার্চে বঙ্গবন্ধুর ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাড়ি কার্যত বাংলাদেশের শাসনক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছিল।

 

১৫ মার্চের মধ্যে দেশ পরিচালনার আসল দায়িত্ব বঙ্গবন্ধু ও তাঁর রাজনৈতিক  সহকর্মীদের কাছে চলে গেল। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনায় প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালিত হতে লাগলো। বাংলাদেশের পুরো ভৌগলিক এলাকার উপর তার প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক কর্তৃত্ব কোন বিদেশি সরকার কর্তৃক সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি দেওয়ার যে শর্ত তার বেশি পূরণ করেছিল। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে দেশ চলছে, বিশ্বে একটি নতুন রাষ্ট্রের জন্ম হতে যাচ্ছে, এই ঘটনার খবর সংগ্রহ করতে আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমগুলোর সাংবাদিকের এক বড় দল তখন বাংলাদেশে উপস্থিত। এভাবে ১৯৭১ সালের মার্চে বঙ্গবন্ধু তৃতীয় বিশ্বের একজন নেতা হয়েও আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমগুলোতে সবচেয়ে বেশি জায়গা করে নিলেন। ১৯৭১ সালের মার্চে বঙ্গবন্ধু স্বশাসনের ঘোষণা দিলেন। এ থেকে বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে সার্বভৌম চেতনার উদ্ভব হলো। পলাশীর যুদ্ধের পর বাংলার মানুষ প্রথমবারের মতন বোধ করলেন তারা স্বাধীন।

 

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালিদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়লে ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দিলেন। এটা ছিল বাংলাদেশের মানুষের উপর ইয়াহিয়ার চালানো নির্যাতনের জবাবে একটি প্রকৃত ও বৈধ কর্তৃত্বকে স্বীকৃতি দেওয়ার আইনি প্রক্রিয়া। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ যখন বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতা ঘোষণা করে, তখনকার বঙ্গবন্ধুর মতন এমন অভূতপূর্ব ক্ষমতার অধিকারী বিশ্বের আর কোন স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতা ছিলেন না। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ডাকে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষ উজ্জীবিত হয়ে ওঠে। তারা ইয়াহিয়ার শাসনকে অগ্রাহ্য করে। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতে যখন পাকিস্তানি বাহিনী ঘুমন্ত নিরস্ত্র বাঙালিদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়লো বীর বাঙালি কোনরকম সামরিক নির্দেশনা ছাড়াই তাদের বিরুদ্ধে স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলল। আপামর বাঙালি দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য অস্ত্র হাতে তুলে নিতে ও রক্ত দিতে তৈরি হয়ে গেল। মুক্তিযোদ্ধারা তাদের রক্ত দিয়ে, জীবন দিয়ে, নারীরা তাদের সম্ভ্রমের বিনিময়ে আমাদের হাতে একটি স্বাধীন দেশের লাল-সবুজ পতাকা তুলে দিয়েছে। স্বাধীনতার রূপকার এবং স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীন বাংলাদেশ উপহার দিতে বারংবার কারাভোগ করেছেন। অত্যন্ত বেদনাদায়ক ঘটনা এটাই যে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট স্বাধীনতার স্থপতিকে তাঁর পরিবার-পরিজনসহ স্বাধীন দেশের মাটিতে, স্বাধীকার আন্দোলনের সূতিকাগার ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাড়িতে কিছু বিপথগামী কুলাঙ্গারের গুলিতে জীবন দিতে হয়েছে। আমরা শ্রদ্ধাভরে বঙ্গবন্ধুর অবদানকে স্বীকার করছি। স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু  শেখ মুজিবুর রহমান ও দেশের লক্ষ লক্ষ শহীদ, আহত মুক্তিযোদ্ধাসহ বীরাঙ্গনা মা- বোনদের কাছে আমাদের আজন্ম ঋণ।

শাহীন চৌধুরী ডলিঃ

লেখক, কবি ও প্রাবন্ধিক