মানবেতর জীবনযাপন করছেন শতভাগ পেনশন সমর্পণকারীরা

মোঃ সাকিবুল ইসলাম সুজন (সিটি রিপোর্টার)
সরকারি চাকরি মানে অবসরের পর স্বাচ্ছন্দ্যে, স্বচ্ছল, টেনশন মুক্ত ভাবে পরিবারের সাথে  জীবনের বাকিটা সময় পার করে দেওয়া। কিন্তু সেখানে তারা কেউ কেউ সময় পার করছেন অবহেলায়, হতাশায়, চোঁখের পানি ফেলে আর মৃত্যুর আগের বাকি দিনগুলো কিভাবে বাঁচবেন সেই চিন্তায়। ভালো থাকার জন্য অনেকে বেছে নিচ্ছেন বেসরকারি চাকুরি, টিউশনি, ছোট খাটো ব্যবসা, কেউবা দিনমজুরের কাজ করেন। অবসর প্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যে যারা ভেবেছিলেন পেনশন সমর্পণ করে এককালীন অর্থ নিয়ে বাকি জীবনের জন্য এবং পরিবারের জন্য টেকসই কোনো ব্যবস্থা গড়ে তুলবেন দূর্ভাগ্যজনক ভাবে তারাই পড়েছেন বিপাকে। গত কয়েক বছরে জীবন ব্যায় বেড়েছে কয়েকগুন। অনেকে অর্থ বিনিয়োগের পরিবর্তে অসুখ-বিসুখে, ছেলে-মেয়ের বিয়ে, থাকার একটা ভাল ঘর তুলতে, ও আত্মীয় স্বজনের পিছনে ব্যায় করেন। অনেকে লাভবান হওয়ার আশায় পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করেন। কিন্তু অস্থির এ বাজার সম্পর্কে অভিজ্ঞতা না থাকায় সর্ব শান্ত হয়ে যান বেশিরভাগই। বেশি লাভের আশায় ডেসটিনির মতো প্রতিষ্ঠানে টাকা দিয়েও প্রতারিত হয়েছেন অনেকে। ২০১৭ সাল থেকে সরকার শতভাগ পেনশন তুলে নেওয়ার বিধান বাতিল করলেও তার আগেই যে লক্ষাধিক অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী শতভাগ পেনশন সমর্পণ করেছেন, তারা এখন অনেকেই মানবেতর জীবনযাপন করছেন। অবশ্য এর মধ্যে অবসর গ্রহণের ১৫ বছর পার হওয়ায় পেনশন পুনর্বহালের নিয়মের ফলে অনেকের জীবনে স্বস্তি ফিরে আসছে আবার অনেকেই বেঁচে নাই তারা এর সুফল ভোগ করতে পারেননি। এখনও প্রায় ৭৮ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারীর পরিবারের সংকট কাটেনি। সংকট নিরসনে তারা শতভাগ পেনশন সমর্পণের আট বছর পরই পেনশন পুনর্বহালের  দাবি তুলেছেন, সরকার নীতিগত ভাবে এই মানবিক আবেদন  মেনে নিয়েছেন বলেই শতভাগ পেনশন সমর্পণকারীদের পেনশন পুনঃস্থাপন করেছেন। এখন তারা শুধু চাচ্ছেন সময়ের ব্যাপ্তিটা হ্রাস করতে। এ নিয়ে আমরা শতভাগ পেনশন সমর্পণকারী কয়েকজনের সাথে কথা বলেছি তাদের মধ্যে
মোঃ সোহরাব হোসেন খান (অবঃ ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার, সোনালী ব্যাংক)
বলেন আমাদের দাবি এক ও অভিন্ন। ইতিমধ্যে পুনঃস্হাপিত পেনশন প্রাপ্তির সময়কাল ১৫ বছরের পরিবর্তে ৮ বছর করা। কারণ হিসেবে তিনি বলেন পুনঃস্হাপিত পেনশনের সুবিধা পেতে হলে তাকে  অন্তত ৭৩ বা ৭৫ বছর বেঁচে থাকতে হবে। এই সিদ্ধান্ত হতাশাজনক। বিবেচনায় আনা হয়নি অবসরের পর ৭৫ বছর বয়স পর্যন্ত বেঁচে থাকা সম্ভব কিনা! যে সুবিধা অন্তত শতকরা ২৫ ভাগ অবসরভোগী ভোগ করতে পারবেন কিনা তা  বিবেচনায় না এনেই সেই সুবিধা প্রদান করার হয়েছে। তাছাড়া পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখা উচিত ছিল যে পেনশন না নিয়ে যে অতিরিক্ত গ্রাচুইটি শতভাগ পেনশন সমর্পণকারীরা নিয়েছেন তা সমন্বয় হয় কত বছরে। ইতোমধ্যে বিষয়টি বিবেচনার জন্য প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে (২২ অক্টোবর ২০২০ তা রিখে, ডাক গ্রহণ নম্বর ৭৬৪৯)  আবেদন করেছেন। যার অনুলিপি অর্থ মন্ত্রণালয় ও জন প্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ২ ডিসেম্বর ২০২০ তারিখে জমা দিয়েছেন।
আখতারুজ্জামান হামিদী (অবঃ যুগ্মসচিব, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়)
বলেন, জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তারা জনগণের যে সেবা দিয়েছেন তার বিনিময়ে হলেও এ সুবিধা পেতে পারেন। এখন তারা শুধু প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের অপেক্ষায় আছেন।
মীর সেলিম (অবঃ উপ- পরিচালক, বিপিডিবি)
বলেন, যদি তারা পেনশন সমর্পণ না করে মাসিক পেনশন নিতেন তাহলে সমর্পন করে যে অর্থ পেয়েছেন তা ১০০ মাসে সমন্বয় হোত। এটার সাথে মহার্ঘ্য ভাতা যুক্ত করলে সমন্বয় হতে সময় লাগতো মাত্র ৮৩ মাস বা ৬ বছর ১১ মাস। তাই প্রধানমন্ত্রীর কাছে আকুল আবেদন যেন ৮ বছরে পেনশন পুনঃস্থাপন করে আমাদের বাকিটা জীবন সুখে শান্তিতে বাঁচতে সাহায্য করেন।
ডা. মঈন উদদীন আহমদ (সচিবালয় ক্লিনিকের সাবেক সিনিয়র কনসালটেন্ট, চক্ষু)
জানান যে, শতভাগ পেনশন সমর্পণকারীগণ প্রকৃতপক্ষে গ্রস পেনশনর  দ্বিতীয় ৫০ শতাংশ ভাগের বিপরীতে প্রচলিত হারের অর্ধেক আনুতোষিক  পেয়েছেন। সরকারের তহবিলে গ্রস পেনশনের ২৫ শতাংশ জমা আছে। এই অতিরিক্ত আনুতোষিক পেনশনভোগীদের  আট বছরের ও কম সময়ে প্রাপ্ত পেনশনের চেয়েও কম।
লতিফুল আজম (অবঃ পরিচালক, বিআরইবি)
বলেন শতভাগ পেনশন সমর্পণকারীগন একই সাথে রাষ্ট্রের প্রবীণ নাগরিকও বটে। তাদের আর্থিক, সামাজিক সুরক্ষা দেয়া সরকারের নৈতিক দায়িত্ব এবং মানবিক ইচ্ছা। মুজিব বর্ষে প্রবীণ নাগরিকদের জন্য সরকার নানামুখী কল্যাণকর পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন। তাই তারাও আশায় আছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তাদের কথা বিবেচনা করবেন এবং ৮ বছরে পেনশন পুনঃস্থাপন করবেন। তারা অধীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করেছেন এমন একটি ঘোষণা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর স্বকন্ঠে তারা শুনতে পারবেন। তারা আশা করছেন এই মুজিববর্ষে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নিশ্চয় প্রার্থিত ঘোষণাটি দেবেন।
কৃষি ব্যাংকের অবসরপ্রাপ্ত শতভাগ পেনশন সমর্পণকারী মূখ্য কর্মকর্তা রন্জিত কুমার বিশ্বাস মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বরাবরে প্রদত্ত একটি আবেদনপত্র উল্লেখ করে বলেন, তিনি ৬ অক্টোবর ২০১১ তারিখে পিআরএল এবং ৬ অক্টোবর ২০১২ তারিখে অবসরে যান। তিনি পেনশনারদের ন্যায় প্রথম ৫০ শতাংশ সমর্পণ করে আনুতোষিক পেয়েছেন এবং পরবর্তী ৫০ শতাংশ  সমর্পণ করে ১০ লাখ ৭০ হাজার টাকা এককালীন আনুতোষিক পেয়েছেন যা সমর্পণ না করলে প্রতিমাসে ১০ হাজার ৭০০ টাকা হিসেবে প্রতিমাসে পেনশন পেতেন। তিনি মাসিক পেনশন ১০ হাজার ৭০০ টাকা হারে, ২০ শতাংশ মহার্ঘ ভাতা, নীট পেনশনের ৪০ শতাংশ যুক্ত করে, ৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট সহ দেখায়েছেন যে, মাত্র ৬ বছরে ১২ লাখ ৯৮ হাজার ৪৮৬ টাকা পেতেন। তার গৃহীত আনুতোষিক ১০ লক্ষ ৭০ হাজার টাকা সমন্বয় হবার পরও ২লাখ ২৮ হাজার ৪৮৬ টাকা অতিরিক্ত হাতে থাকতো।
পেনশন সমর্পণকারীগন ২০০৯ সালের আগের ছয়টি জাতীয় বেতন স্কেলের কোনোটিতেই ৫০ ভাগের বেশি বেতন বৃদ্ধি পায়নি। ওই সময় সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন ছিল প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। বর্তমান সরকার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে ২০০৯ সালে প্রবর্তিত সপ্তম জাতীয় বেতন স্কেলে ৭৫ ভাগ বেতন ও ২০১৫ সালে প্রবর্তিত অষ্টম জাতীয় বেতন স্কেলে গড়ে ১৩০ ভাগ বেতন বৃদ্ধি করেছে।
ফেসবুকে ১২৬৬ জন নিবন্ধনকৃত  ’শতভাগ পেনশন সমর্পণকারী গ্রুপের’ সদস্যগণ গাণিতিক হিসাব কষে দেখায়েছেন যে তারা শতভাগ পেনশন সমর্পণ করে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন। তৎসময়ের সরকারের ১লা জুন ১৯৯৪ তারিখে প্রবর্তিত ভ্রান্ত পেনশন নীতির কারণে তারা শতভাগ পেনশন সমর্পণ ‘টোপ হিসেবে ভক্ষণ করেন’। বর্তমান সরকার পেনশনারদের অবসরকালীন আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিতকল্পে  ৯ জানুয়ারী ২০১৭ তারিখে শতভাগ পেনশন সমর্পণ সুবিধা বাতিল করেন। শতভাগ পেনশন সমর্পণকারীদের জন্য ১৫ বছরের স্থলে ৮ বছর পর পেনশন পুনঃস্থাপনের আবেদন বাস্তবায়ন করতে সরকারের প্রয়োজন হতে পারে ২২৬ কোটি টাকারও কম। কেননা, ৫৮ বা ৬০ বছরে চুড়ান্ত অবসর গ্রহণের পর আরো ১৫ বছর অর্থাৎ ৭৩ বা ৭৫ বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করা সম্ভবপর না হওয়ায় দুরারোগ, আর্থিক সংকট, পারিবারিক ও সন্তানদের মানষিক নির্যাতন ইত্যাদি কারণে অধিকাংশ শতভাগ পেনশন সমর্পণকারী অকাল মৃতু্কে আলিংগন করছেন। তারা স্বপ্ন দেখেছিলেন ৭৩ বা  ৭৫ বছর পার হলে তিনি পেনশনে প্রত্যাবর্তন করবেন, তার মৃত্যুর পর তার স্ত্রী পেনশনভোগী হয়ে অবশিষ্ট দিন নিশ্চিত আর্থিক সুরক্ষায় অতিবাহিত করবেন। কিন্তু বিধি বাম, আশা দুরাশাই রয়ে গেল তাদের জন্য। বাস্তবতা হল এই ১৫ বছরের ধাক্কা নিষ্ঠুর পৃথিবী তাকে পেনশনের আস্বাদন ভোগ করার সুযোগ দিল না। পেনশনারদের ন্যায় তাদেরকেও একই সারিতে রাখা সমীচীন বলে তারা মনে করেন। বর্তমান সরকারের আন্তরিকতা আছে বলেই ৮ অক্টোবর ২০১৮  জারীকৃত এক প্রজ্ঞাপনে  শতভাগ পেনশন সমর্পণকারীদের পেনশনে পুনঃস্থাপন ১৫ বছরে নির্ধারণ করে, তা উক্ত সরকার মানবিক বিবেচনায় ১৫ বছর হ্রাস করে ৮ বছর পুনর্নির্ধারণ করবেন বলে তারা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আস্থা রাখেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নিশ্চয় মাদার অব হিউম্যানেটি হিসেবে তাদের আবেদন মঞ্জুর করে সকল অবসরপ্রাপ্ত প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের একই পেনশনের ছাতার নিচে রাখবেন বলে তারা আশায় বুক বেঁধে আছেন।