বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু প্রনব মুখার্জির প্রস্থান,এক রাজনৈতিক মহাকাব্যের সমাপ্তি

সৈয়দ চয়নঃ ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি এবং কংগ্রেসের বর্ষীয়ান নেতা প্রনব মুখার্জি মারা গেছেন। সোমবার (৩১ আগস্ট) স্থানীয় একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৪ বছর।
৬০ বছরের রাজনৈতিক জীবনে ভারতের পররাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা, যোগাযোগ, অর্থসহ গুরুত্বপূর্ণ অনেক মন্ত্রণালয় সামলেছেন তিনি। ভারত-মার্কিন অসামরিক পরমাণু চুক্তি সই বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে তার অন্যতম অর্জন।
অসামান্য প্রজ্ঞার অধিকারী প্রণব দল, দলের বাইরে সর্বত্র বিশেষ শ্রদ্ধারপাত্র ছিলেন। ভারতের সর্বোচ্চ ও দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মান ভারতরত্ন ও পদ্মবিভূষণ এবং শ্রেষ্ঠ সাংসদ পুরস্কারে ভূষিত হন বাঙালি এ রাজনীতিবিদ। ১৯৮৪ সালে ব্রিটেনের ইউরোমানি পত্রিকার জরিপে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ৫ অর্থমন্ত্রীর অন্যতম হিসেবে বিবেচিত হন তিনি।
১৯৩৫ সালের ১১ ডিসেম্বর অধুনা পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার কীর্ণাহারের মিরাটি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। বাবা কামদাকিঙ্কর মুখোপাধ্যায় ও মা রাজলক্ষ্মী দেবী। বিশিষ্ট স্বাধীনতা সংগ্রামী কামদাকিঙ্কর ১৯২০ সাল থেকে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের একজন সক্রিয় সদস্য ছিলেন। ব্রিটিশ শাসনকালে তিনি ১০ বছর কারারুদ্ধ ছিলেন।
প্রণব মুখোপাধ্যায় কলেজ শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরে তিনি সাংবাদিকতা করেন কিছুকাল। ‘দেশের ডাক’ নামে একটি পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের ট্রাস্টি ও পরে নিখিল ভারত বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলনের সভাপতি হন তিনি।
১৯৬৯ সালে প্রণব মুখোপাধ্যায় কংগ্রেসের টিকিটে রাজ্যসভার সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর রাজনৈতিক কর্মজীবনে তার দ্রুত উত্থান শুরু হয়। ইন্দিরা গান্ধীর একজন বিশ্বস্ত সহকর্মীতে পরিণত হন। ১৯৭৩ সালে ইন্দিরা গান্ধীর মন্ত্রিসভায় স্থান পান। ১৯৮২-৮৪ পর্বে তিনি ছিলেন ভারতের অর্থমন্ত্রী। ১৯৮০ থেকে ১৯৮৫ পর্যন্ত তিনি রাজ্যসভার দলনেতাও ছিলেন। প্রণব মুখোপাধ্যায় প্রায় ৫ দশক ভারতীয় সংসদের সদস্য ছিলেন।
১৯৭৫, ১৯৮১, ১৯৯৩ ও ১৯৯৯ সালেও তিনি রাজ্যসভায় নির্বাচিত হন।
ইন্দিরা গান্ধীর হত্যার পর একটি দলীয় গোষ্ঠী দ্বন্দ্বের শিকার হন তিনি। রাজীব গান্ধী তাকে নিজের মন্ত্রিসভায় স্থান দেননি। বহিষ্কার হয়েছেন কংগ্রেস থেকেও। তখন রাষ্ট্রীয় সমাজবাদী কংগ্রেস নামে একটি দল গঠন করেন। ১৯৮৯ সালে রাজীব গান্ধীর সংকট মিটিয়ে এই দল নিয়ে তিনি আবার কংগ্রেসে যোগ দেন।
২০১২ সালে এনডিএ প্রার্থী লোকসভার সাবেক স্পিকার মেঘালয়ের ভূমিপুত্র পিএন সাংমাকে ৭১ শতাংশের বেশি ভোটে হারিয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন ইউপিএ প্রার্থী প্রণব মুখার্জি। ২০১২ সালের ২৫ জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন তিনি।
১৯৫৭ সালের ১৩ জুলাই প্রণব মুখোপাধ্যায় পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হন শুভ্রা মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে। তাদের দুই ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে।
২০১৩ সালের ৫ মার্চে বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অসামরিক পুরস্কার বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ সম্মাননায় ভূষিত হন প্রণব মুখার্জী। এছাড়াও জাতীয় আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বহু সম্মাননা পুরস্কার অর্জন করেছেন তিনি।