গালিব ফেরদৌস এর শিশুতোষ গল্প “নাগমনি”

“নাগমনি”
——————-
“জানো দাদু গ্রিন ভাইপার সাপ কামড়ানোর ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে মানুষ মারা যায়।” আমি বললাম।
“জানি।” দাদু বলল।
“সাপের বিষ আসলেও খুব মারাত্মক জিনিস।”
“জানিস সাপের বিষে কি থাকে?”
“না।”
“পটাশিয়াম সায়ানাইড। এই উপাদানটা যখন রক্তে মেশে তখন রক্ত আর অক্সিজেন পরিবহন করে সারাদেহে পৌছাতে পারে না। ফলে মানুষ দম আটকে মারা যায়। মজার ব্যাপার হল এই সাপ নিয়ে আমার সাথে একটা মজার ঘটনা ঘটেছিল সুন্দরবনে।”
“কিরকম?”
দাদু স্বভাবজাত কাশি দিয়ে গল্প বলা শুরু করলেন।
“ওয়ারশ শহরটাকে চিনিস? ৃৃৃৃ.. ওটা হল বর্তমান পোল্যান্ডের রাজধানী। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে জায়গাটা অষ্ট্রিয়ার মধ্যে ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অষ্ট্রিয়া ছিল জার্মাানী তথা অক্ষশক্তির দলে আর পোল্যান্ড ছিলো আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র তথা মিত্রশক্তির দলে। জার্মানীর তথা অক্ষশক্তির শিরোমণি এডলফ্ হিটলারের পতন ঘটলে ১৯৪৫ সালের পর ওয়ারশ শহরটি আমেরিকানরা দখল করে নেয়। এরপর শহরটি পোল্যান্ডের অধীনস্থ হয়ে পড়ে এবং রাজধানী শহরে পরিণত হয়। সেই প্রাচীন শহর ওয়ারশয়ের আর্মি মির¯েøাভ কলোডকো একবার সুন্দরবন ঘুরতে এলেন। তিনি নাকি কোথায় পড়েছেন সুন্দরবনে নাকি একটা গোপন শহর আছে যেখানে নাগেরা বসবাস করে। তাদের শক্তির প্রাণকেন্দ্র হচ্ছে নাগমণি। এই নাগমণি একবার কারও হাতে এলে সে পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী ব্যক্তিতে পরিণত হয় ভাগ্যচক্রে। এই নাগমণির কারণে নাগেরা মানুষ থেকে সাপ আবার সাপ থেকে মানুষে রুপান্তরিত হতে পারে। ওটা ওদের কাছে না থাকলে কেউ আর রুপান্তরিত হতে পারে না। আর ঐ নাগমণি যদি কারও কাছে চলে যায় পৃথিবীর সমস্ত নাগকে সে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। তারপর তাদেরকে বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করতে পারে। তাই কলোডকো সেই নাগমণির খোঁজে সুন্দরবনে এলো। আমি তাকে নিয়ে সুন্দরবন চষে ফেললাম। হিরণ পয়েন্টের কাছে পুলনি দ্বীপ পেরিয়ে জেফার্ড পয়েন্ট থেকে খানিকটা ভেতরে বঙ্গোপসাগরের কাছাকাছি আরেকটা দ্বীপমতো জায়গায় প্রথম আমার নজরে পড়ল নাগ শহর। যেটা একটা প্রাগৈতিহাসিক শহর। সুন্দরবনের মিথ ঘাটলে ঐ নাগশহরের অস্তিত্বের কথা জানা যায়। কিন্তু সুন্দরবন তখন এত দুর্গম যে ঐ নাগ শহর তখনও লোকচক্ষুর অন্তরালে ছিল। আমরা দু’জনে নাগশহরে প্রবেশ করলাম। মাটি দিয়ে সব বাড়ি তৈরি করা। একটার পর একটা বাড়ি। পুরো শহরটা খাঁ খাঁ করছে। কেউ নেই কোথাও। সব নাগরা তখন বোধ হয় খাদ্য অন্বেষনে বেরিয়েছে। হঠাৎ একটা প্রাসাদোপম বাড়ি নজরে পড়ল আমার। ওটা সম্ভবত মন্দির। ওখানেই বোধ হয় নাগমণি সংরক্ষন করে রাখে নাগরা। আমরা ওটার ভিতরে ঢুকলাম। দেখি সেখানেও কেউ নেই। হঠাৎ সমস্ত ভূমি দুলে উঠলো। সম্ভবত ভূমিকম্প। আমরা ভয় পেয়ে গেলাম। ভূমিকম্প থামল কিছুক্ষণ পর। যাহোক মন্দিরের ভেতর একটা জায়াগায় দেখলাম সবুজ রঙের একটা জ্বলজ্বলে মণি রাখা রয়েছে। বুঝলাম ওটাই নাগমণি। কলোডকোর তখন লোভে চোখ চকচক করছে। বিপদ হতে পারে বুঝে আমি কলোডকোকে বললাম,” চলো আমরা ফিরে যাই।”
সে ভাঙ্গা ভাঙ্গা ইংরেজিতে বলল, “ঐ নাগমণি না নিয়ে আমি এখান থেকে যাব না।”
কলোডকো যেই নাগমনিটা নিতে যাবে হঠাৎ কোত্থেকে কতগুলো সাপ এসে আমাদের ঘিরে ধরল। বুঝলাম ওগুলো নাগ। ওগুলো কিছুক্ষণ পর মানুষের রূপধারণ করল। এরপর ওরা আমাদেরকে উদ্দেশ্য করে বলল, “তোরা নাগমণি চুরি করতে এসেছিস?”
কলোডকো হিং¯্রকন্ঠে বলল, “ওটা আমরা এখান থেকে নিয়ে যাব।”
তখন নাগদের মধ্যে একজন বলল, “তা আমরা কখনোই হতে দেব না।”
এই বলেই ওদের কয়েকজন আমাদের দিকে এগিয়ে আসতে লাগল। কলোডকোর কাছে স্মিথ এন্ড ওয়েসসন কোম্পানীর একটা বন্দুক ছিল। সে ওটা দিয়ে গুলি ছুড়ল ওদের উদ্দেশ্যে। তাতে আহত হলো কয়েকটা নাগ। আর দু’জন মারা গেল। বাকি নাগেরা ক্ষেপে গেল আমাদের উপর। তাৎক্ষনিক একটা নাগ সাপের রূপ ধরল। আর কলোডকোকে দংশন করল। নাগদের দাঁতে তীব্র বিষ থাকে। ঐ বিষে মুখে ফেনা উঠে কলোডকো তৎক্ষনিক মারা গেল। নাগেরা আমার দিকেও এগিয়ে আসাতে থাকে। আর ঠিক তখনই প্রচন্ড ভূমিকম্প শুরু হল একনাগাড়ে এবং মজার ব্যাপার হল তাতে নাগদ্বীপ বঙ্গোপসাগরে ডুবতে শুরু করলো। নাগরা জীবন বাঁচাতে এদিক ওদিক ছুটতে থাকে। পুরো শহরটা জলের নিচে ডুবে গেল কিছুক্ষণের মধ্যে। আর আমি একটা গোড়াসুদ্ধ উপড়ে আসা বঙ্গোপসাগরের জলে ভেসে থাকা গাছ জড়িয়ে কোন মতে প্রাণ বাঁচালাম। এরপর আর কিছু মনে নেই। যখন জ্ঞান ফিরল তখন নিজেকে একটা জেলে নৌকায় আবিস্কার করি। ওরাই পরে আমাকে কয়রা শহরে পৌছে দেয়।”
এই বলে দাদু গল্প বলা শেষ করলেন। আর আমি ভাবতে লাগলাম পৃথিবীর একমাত্র নাগমণি তাহলে বঙ্গোপসাগরের জলে ডুবে এভাবেই নিশ্চিহ্ন হয়েছিল।